ই-নামজারি আবেদন প্রক্রিয়া: অনলাইনে ই-পর্চা, ডিসিআর ও খতিয়ান সংগ্রহের নিয়ম

বাংলাদেশে সম্পত্তি আইনের পরিমণ্ডল বুঝতে হলে ভূমি রাজস্ব প্রশাসন সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা আবশ্যক, যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ভূমি মিউটেশন, যা স্থানীয়ভাবে নামজারি নামে পরিচিত। আপনি ক্রয়, ওয়ারিশ/উত্তরাধিকার, দান (হেবা) কিংবা বিনিময়ের মাধ্যমেই সম্পত্তির মালিকানা অর্জন করে থাকুন না কেন, আপনার মালিকানা…

ID: 1098 4,505 words

উৎস ও যাচাইয়ের তথ্য

এই গাইডের বিশ্বাসযোগ্যতার সংকেত

এগুলো এই কনটেন্ট রেকর্ডের মেটাডেটা। এগুলো কোনো নির্দিষ্ট আইনি ফলাফল বা বর্তমান আইনের নিশ্চয়তা নয়।

স্ট্যাটিক প্রকাশনার জন্য প্রস্তুত
আইনি উৎসের রেফারেন্স
এই রেকর্ডে কোনো উৎস-রেফারেন্স দেওয়া নেই।
রেকর্ডের অবস্থা

সর্বশেষ পর্যালোচনার তারিখ রেকর্ড করা নেই

ইংরেজি-বাংলা জোড়া যাচাই করা

রেকর্ড আইডি: 1098

গুরুত্বপূর্ণ: এটি সাধারণ তথ্য, আইনি পরামর্শ নয়। আপনার পরিস্থিতির জন্য যোগ্য আইনজীবীর পরামর্শ নিন এবং সরকারি প্রকাশনা যাচাই করুন।

দ্রুত ধারণা

নির্বাহী সারসংক্ষেপ

বাংলাদেশে সম্পত্তি আইনের পরিমণ্ডল বুঝতে হলে ভূমি রাজস্ব প্রশাসন সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা আবশ্যক, যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ভূমি মিউটেশন, যা স্থানীয়ভাবে নামজারি নামে পরিচিত। আপনি ক্রয়, ওয়ারিশ/উত্তরাধিকার, দান (হেবা) কিংবা বিনিময়ের মাধ্যমেই সম্পত্তির মালিকানা অর্জন করে থাকুন না কেন, আপনার মালিকানা…

বিষয় property land
পড়ার সময় প্রায় 21 মিনিট
সর্বশেষ তারিখ রিভিউ অপেক্ষমাণ
English Edition Looking for the authoritative English legal edition?
Read English Guide →

নির্বাহী সারসংক্ষেপ ও সামগ্রিক বিবরণ

বাংলাদেশে সম্পত্তি আইনের পরিমণ্ডল বুঝতে হলে ভূমি রাজস্ব প্রশাসন সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা আবশ্যক, যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ভূমি মিউটেশন, যা স্থানীয়ভাবে নামজারি নামে পরিচিত। আপনি ক্রয়, ওয়ারিশ/উত্তরাধিকার, দান (হেবা) কিংবা বিনিময়ের মাধ্যমেই সম্পত্তির মালিকানা অর্জন করে থাকুন না কেন, আপনার মালিকানা প্রতিফলিত করার লক্ষ্যে সরকারের রাজস্ব রেকর্ড হালনাগাদ করা একটি বাধ্যতামূলক সংবিধিবদ্ধ বিধান। নামজারি সম্পন্ন না হলে আপনার সম্পত্তি আইনগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ থাকে, আপনি ভূমি উন্নয়ন কর (এলডিটি) পরিশোধ করতে পারবেন না এবং পরবর্তীতে উক্ত জমি হস্তান্তর বা বন্ধক রাখার ক্ষেত্রে আইনগত বাধার সম্মুখীন হবেন।

বিশেষ তথ্য: বাংলাদেশে জমির নামজারি হলো ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ১৪৩ ধারার অধীন স্বত্বলিপি (খতিয়ান) হালনাগাদ করার একটি সংবিধিবদ্ধ আইনি প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমে নতুন মালিকের ওপর ভূমি রাজস্ব প্রদানের দায় ন্যস্ত হয়। অফিশিয়াল ই-নামজারি ফি নির্ধারিতভাবে মোট ১,১৫০ টাকা, যা অনলাইনে পরিশোধযোগ্য।

২০২১ সালে ভূমি মন্ত্রণালয় ভূমি নামজারি নির্দেশিকা, ২০২১ প্রণয়ন করে এবং mutation.land.gov.bd পোর্টালের মাধ্যমে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি ডিজিটাইজ করে ঐতিহ্যগতভাবে চলে আসা এই অস্বচ্ছ কার্যপ্রণালীতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে। সম্পত্তির মালিক, আইনজীবী এবং রিয়েল এস্টেট পেশাজীবীদের জন্য প্রণীত এই প্রামাণ্য নির্দেশিকাটিতে ই-নামজারি প্রক্রিয়ার আদ্যোপান্ত বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে ডিজিটাল আবেদন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ডের নিকট আধা-বিচারিক (কোয়াসি-জুডিশিয়াল) শুনানি, নির্দিষ্ট সংবিধিবদ্ধ ফি কাঠামো (১,১৫০ টাকার ডিসিআর ফি পরিশোধ) এবং বাংলাদেশে সম্পত্তির স্বত্বের ভিত্তি স্থাপনকারী ভূমি জরিপসমূহের (সিএস, এসএ, আরএস, বিএস) জটিল স্তরবিন্যাস সম্পর্কে ধাপে ধাপে পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।


ধাপ ১: আবেদন ও ফিmutation.gov.bd-এতথ্য ও দলিল আপলোডআবেদন ও নোটিশ ফি৭০/- টাকা প্রদানধাপ ২: প্রতিবেদন যাচাইইউনিয়ন ভূমি সহকারীকর্মকর্তার তদন্ত ও প্রস্তাবকাগজপত্র ও দখল যাচাইপ্রতিবেদন প্রেরণধাপ ৩: শুনানি ও আদেশএসিল্যান্ড কর্তৃক নোটিশমূল দলিলসহ শুনানি গ্রহণআবেদন মঞ্জুর বা নামঞ্জুরচূড়ান্ত অনুমোদনধাপ ৪: ডিসিআর ও খতিয়ানডিসিআর ফি ১,১০০/- প্রদানঅনলাইন কিউআর কোডযুক্তই-ডিসিআর ও ই-পর্চাসরাসরি ডাউনলোড

২০২৬ সংবিধিবদ্ধ বাধ্যবাধকতা: কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি জোনিং আইন, ২০২৬ ও ই-নামজারি

কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি জোনিং আইন, ২০২৬ এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক পরিপত্র অনুযায়ী ই-নামজারি কার্যক্রমে নতুন আবশ্যিক শর্তাবলি কার্যকর হয়েছে:

  • উপজেলা ভূমি জোনিং ছাড়পত্র: বাণিজ্যিক, শিল্প বা আবাসন উদ্দেশ্যে কৃষিজমি রূপান্তর বা নামজারির পূর্বে উপজেলা ভূমি জোনিং কমিটি কর্তৃক সংবিধিবদ্ধ অনাপত্তি সনদ দাখিল বাধ্যতামূলক।
  • আজীবন ভোগদখল স্বত্ব খতিয়ানে এন্ট্রি: সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) আইন ২০২৬ এর ১২২ক ধারা মোতাবেক হেবা বা দান দলিলে দাতার আজীবন ভোগদখল সংরক্ষিত থাকলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) উক্ত স্বত্ব নামজারি খতিয়ান বা ডিআরে লিপিবদ্ধ করতে আইনত বাধ্য।
  • ই-পর্চা ও ডিসিআর এর স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল ভেরিফিকেশন: সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে নামজারি আবেদন প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় ল্যান্ড পোর্টালের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় খাজনা ও কিস্তিবার দাখিলা নিশ্চিত করা হয়।

আইনগত কর্তৃত্ব: কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি জোনিং আইন, ২০২৬; ভূমি সংস্কার ও অপরাধ প্রতিরোধ বিধিমালা; ভূমি মন্ত্রণালয় ২০২৬।

১. নামজারির সংবিধিবদ্ধ ও তাত্ত্বিক আইনগত কাঠামো

আইন ও বিধিধারা / অনুচ্ছেদমূল বিষয়বস্তু ও আইনি বিধানপ্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ
স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি অ্যাক্ট, ১৯৫০ধারা ১৪৩স্বত্বলিপি বা রেকর্ড অব রাইটস (খতিয়ান) সার্বক্ষণিক হালনাগাদকরণের বাধ্যবাধকতা এবং হস্তান্তরিত ভূমির মালিকানা প্রতিস্থাপন।সহকারী কমিশনার (ভূমি)
স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি অ্যাক্ট, ১৯৫০ধারা ১১৬ ও ১১৭জোত বিভাজন (Sub-division of holding) ও পৃথক খতিয়ান সৃজনপূর্বক নির্ধারিত ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা পৃথকীকরণ।সহকারী কমিশনার (ভূমি) / রাজস্ব কর্মকর্তা
ভূমি নামজারি নির্দেশিকা, ২০২১অনুচ্ছেদ ৩ ও ৪শতভাগ ডিজিটাল মাধ্যমে ই-নামজারি আবেদন দাখিল, আবেদন ট্র্যাকিং এবং সর্বোচ্চ ২৮ কার্যদিবসের মধ্যে সেবা নিষ্পত্তির সময়সীমা।উপজেলা ভূমি অফিস ও ইউএলএও
ভূমি রাজস্ব আইন ও পরিপত্র (অর্থ মন্ত্রণালয় ও ভূমি মন্ত্রণালয়)পরিপত্র নং ০৫/২০২০ই-নামজারির নির্ধারিত সরকারি ফি (আবেদন ফি ২০ টাকা + নোটিশ জারি ৫০ টাকা = ৭০ টাকা এবং রেকর্ড সংশোধন ১,০০০ টাকা + খতিয়ান ফি ১০০ টাকা = ১,১০০ টাকা; মোট ১,১৭০ টাকা)।ভূমি মন্ত্রণালয় ও সোনালী পেমেন্ট গেটওয়ে
স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি অ্যাক্ট, ১৯৫০ধারা ১৪৭ ও ১৫০সহকারী কমিশনারের (ভূমি) নামজারি নামঞ্জুর বা আদেশ বাতিলের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সমীপে আপিল ও রিভিউ দায়ের।অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) / জেলা কালেক্টর

জমির নামজারির ব্যবহারিক প্রয়োগে দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রথমে রাজস্ব কর্মকর্তাদের এখতিয়ার পরিচালনাকারী মূল আইন (substantive law) এবং সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের নজিরসমূহ বোঝা অপরিহার্য। নামজারি কেবল কোনো সাধারণ প্রশাসনিক কাজ নয়; এটি একটি সুনির্দিষ্ট বিধিবদ্ধ আইনি প্রক্রিয়া।

১.১ নামজারি নিয়ন্ত্রণকারী প্রাথমিক আইনসমূহ

ভূমি নামজারির আইনি ক্ষমতা মূলত ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন (১৯৫১ সালের পূর্ববঙ্গ আইন নং ২৮) [এসএটি অ্যাক্ট] থেকে উদ্ভূত। * ১৪৩ ধারা (স্বত্বলিপি বা খতিয়ান রক্ষণাবেক্ষণ): এটি হলো মূল আইনি বিধান। নামজারি, উত্তরাধিকার বা আইনসম্মত হস্তান্তরের মাধ্যমে সৃষ্ট পরিবর্তনগুলো অন্তর্ভুক্ত করে স্বত্বলিপি (খতিয়ান) রক্ষণাবেক্ষণ ও হালনাগাদ করার জন্য এটি কালেক্টরকে (যার ক্ষমতা এসি ল্যান্ডের ওপর অর্পিত) নির্দেশ দেয়। * ১১৭ ধারা (জোত বিভাজন): যখন কোনো সহ-শরিক যৌথ সম্পত্তির নিজস্ব নির্দিষ্ট অংশ হস্তান্তর করেন, তখন ১১৭ ধারা রাজস্ব কর্তৃপক্ষকে জোতটি বিভাজন (sub-division) করার এবং তদনুযায়ী খাজনার দায় বণ্টন করার ক্ষমতা প্রদান করে। * ১৪৩এ ধারা: ১৯৯৪ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে সন্নিবেশিত এই ধারাটি নিবন্ধিত দলিলের ভিত্তিতে খতিয়ান হালনাগাদ করার একটি বিশেষ বিধান তৈরি করে, যা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ও ভূমি অফিসের মধ্যে আন্তঃসংযোগকে সুগম করেছে। * ১৪৪ ও ১৪৪এ ধারা: এই ধারাগুলো সরকারি জরিপ চলাকালীন স্বত্বলিপি প্রস্তুত ও সংশোধন কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত খতিয়ানের ক্ষেত্রে নির্ভুলতার সংবিধিবদ্ধ অনুমান (presumption of correctness) প্রতিষ্ঠা করে।

এসএটি অ্যাক্ট ছাড়াও নামজারি প্রক্রিয়াটি সম্পত্তি হস্তান্তর সংক্রান্ত বিভিন্ন আইনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত: * ১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইন (ধারা ৫৩সি): এই ধারাটি কোনো হস্তান্তরকারী বা তার প্রত্যক্ষ পূর্বসূরির নামে হালনাগাদ খতিয়ান না থাকলে যেকোনো বিক্রয় দলিল সম্পাদনের ক্ষেত্রে কঠোর আইনি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সহজ কথায়, যে জমি আপনার নামে নামজারি করা নেই, তা আপনি বিক্রি করতে পারবেন না। * ১৯০৮ সালের রেজিস্ট্রেশন আইন (ধারা ৫২এ): কোনো সাব-রেজিস্ট্রার হস্তান্তরের দলিল নিবন্ধনের জন্য গ্রহণ করার পূর্বে সর্বশেষ স্বত্বলিপি (নামজারি খতিয়ান) এবং হালনাগাদ ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের দাখিলা পেশ করা এই বিধানে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। * ভূমি সংস্কার আইন, ২০২৩ (২০২৩ সালের ২৯ নং আইন): পূর্ববর্তী ১৯৮৪ সালের অধ্যাদেশকে প্রতিস্থাপন করে এই আইনের ৪ ধারায় কৃষি জমির সিলিং বা সর্বোচ্চ সীমা পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে, যা কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের অনুকূলে সর্বোচ্চ ৬০ প্রমিত বিঘার বেশি কৃষি জমি রাখার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে। আবেদনকারীর মোট জমির পরিমাণ যদি এই নির্ধারিত আইনি সীমা অতিক্রম করে, তবে এসি ল্যান্ড উক্ত নামজারি আবেদন বাতিল করতে আইনগতভাবে বাধ্য।

১.২ হাইকোর্টের বিচারিক নজির: নামজারির আইনগত সীমাবদ্ধতা

বাংলাদেশে একটি প্রচলিত কিন্তু বিপজ্জনক ভুল ধারণা হলো, নামজারি খতিয়ানই মালিকানার চূড়ান্ত বা প্রশ্নাতীত দলিল। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট বারবার নামজারির প্রকৃত আইনগত রূপ স্পষ্ট করেছেন।

  • নামজারি স্বত্ব বা মালিকানা প্রদান করে না: মো. জয়নাল আবেদীন ও অন্যান্য বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য (২০১৮) ৭০ ডিএলআর (এইচসিডি) ৩৭৮ এর ঐতিহাসিক মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন যে, রাজস্ব রেকর্ডে কোনো নামজারি ভুক্তি স্থাবর সম্পত্তিতে কোনো স্বত্ব সৃষ্টি, বিলোপ বা হস্তান্তর করে না। নামজারি মূলত রাজস্ব আদায়ের উদ্দেশ্যে প্রণীত একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া—যার উদ্দেশ্য কেবল রাষ্ট্রের প্রাপ্য ভূমি রাজস্ব বা খাজনা প্রদানের দায় কার ওপর বর্তায় তা চিহ্নিত করা। প্রকৃত স্বত্ব সর্বদা বৈধ রেজিস্ট্রিকৃত হস্তান্তর, উত্তরাধিকার বা চিরভোগের অধিকারের (prescriptive rights) ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।
  • রাজস্ব রেকর্ডের চেয়ে মূল মালিকানার দলিল প্রাধান্য পায়: আব্দুল মান্নান বনাম কোর্ট অব ওয়ার্ডস (১৯৮৩) ৩৫ ডিএলআর (এডি) ১৬৫ মামলায় আপিল বিভাগ সিদ্ধান্ত প্রদান করেন যে, রেজিস্ট্রিকৃত হস্তান্তরের দলিল এবং নামজারি এন্ট্রির মধ্যে কোনো বিরোধ দেখা দিলে আর্থিক বা রাজস্ব রেজিস্টারের ওপর মূল স্বত্বের দলিলই প্রাধান্য পাবে।
  • সহকারী কমিশনারের (ভূমি) এখতিয়ারের সীমাবদ্ধতা: হাজী নুরুল ইসলাম বনাম সহকারী কমিশনার (ভূমি) (২০১৪) ১৯ বিএলসি (এইচসিডি) ৬৮২ মামলায় আদালত রায় দেন যে, ১৯৫০ সালের এসএটি অ্যাক্টের ১৪৩ ধারার অধীনে এসি ল্যান্ডের কোনো রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের কার্যকারিতা বাতিল, শূন্য বা রদ করার ক্ষমতা নেই। আবেদনকারী যদি বৈধভাবে নিবন্ধিত একটি দলিল উপস্থাপন করেন, তবে দলিলটি জাল বা প্রতারণামূলক এমন অভিযোগ তুলে এসি ল্যান্ড নামজারি নামঞ্জুর করতে পারেন না; জালিয়াতি বা প্রতারণার ঘোষণা প্রদান সংক্রান্ত বিচারিক ক্ষমতা ১৮৭৭ সালের সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের অধীনে কেবলমাত্র উপযুক্ত দেওয়ানি আদালতের একান্ত এখতিয়ারভুক্ত।

২. জরিপের ধারাবাহিক স্তরবিন্যাস: সিএস, এসএ, আরএস এবং বিএস/সিটি জরিপ

ই-নামজারি আবেদন দাখিল করার পূর্বে আপনাকে অবিচ্ছিন্ন "মালিকানা পরম্পরা" বা চেইন অব টাইটেল (chain of title) প্রমাণ করতে হবে। এসি ল্যান্ড বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ক্যাডাস্ট্রাল জরিপগুলোর মাধ্যমে জমির মালিকানার ধারাবাহিক ইতিহাস যাচাই করবেন। এই জরিপগুলোর মধ্যে কোনো একটি সংযোগ বা ধারাবাহিকতা অনুপস্থিত থাকলে আপনার নামজারি আবেদন প্রত্যাখ্যাত হবে।

২.১ ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে (সিএস)

  • সময়কাল: ১৮৮৮–১৯৪০।
  • আইনি ভিত্তি: বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন, ১৮৮৫ (Bengal Tenancy Act, 1885)।
  • তাৎপর্য: সিএস জরিপ হলো ভারতীয় উপমহাদেশের ভূমি প্রশাসনের মূল ভিত্তিপ্রস্তর। এর মাধ্যমেই সর্বপ্রথম বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিমাপকৃত নকশা (মৌজা নকশা) এবং প্রজাস্বত্ব রেজিস্টার তৈরি করা হয়। আধুনিক স্বত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ না হলেও পরবর্তী সকল মালিকানার দাবি যৌক্তিকভাবে মূল সিএস রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত প্রজার সূত্র ধরেই প্রমাণ করতে হয়।

২.২ স্টেট একুইজিশন সার্ভে (এসএ)

  • সময়কাল: ১৯৫৬–১৯৬২।
  • আইনি ভিত্তি: ১৯৫০ সালের এসএটি অ্যাক্টের ১৭ থেকে ৩১ ধারা।
  • তাৎপর্য: জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর সরকার অত্যন্ত দ্রুততার সাথে এসএ জরিপ পরিচালনা করে প্রকৃত চাষি ও প্রজাদের নাম রেকর্ডভুক্ত করে, যারা সরাসরি রাষ্ট্রের অধীনে প্রজা হিসেবে পরিগণিত হন। মাঠপর্যায়ে প্রত্যক্ষ পরিমাপের চেয়ে বিদায়ী জমিদারদের দাখিলকৃত কাগুজে রিটার্নের ওপর বহুলাংশে নির্ভর করে তড়িঘড়ি করে এই জরিপ পরিচালিত হওয়ায় এসএ রেকর্ড করণিক ভুল এবং "কাগুজে খাজনা" বা অস্তিত্বহীন ভুক্তির জন্য কুখ্যাত।

২.৩ রিভিশনাল সার্ভে (আরএস)

  • সময়কাল: ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ১৯৯০-এর দশক পর্যন্ত।
  • আইনি ভিত্তি: ১৯৫০ সালের এসএটি অ্যাক্টের ১৪৪ ধারা।
  • তাৎপর্য: এসএ রেকর্ডে বিদ্যমান ব্যাপক অসঙ্গতি ও ভুলভ্রান্তি সংশোধনের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে আরএস জরিপ শুরু হয়েছিল। মাঠপর্যায়ে প্রকৃত দখল এবং ঐতিহাসিক সিএস সীমানার সাথে রেকর্ড সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে জরিপকারীরা সরাসরি মাঠে গিয়ে কাজ করেন। যেখানে এসএ এবং আরএস উভয় রেকর্ড বিদ্যমান এবং তাদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়, সেখানে প্রকাশনার সময়ের দখল সংক্রান্ত বিষয়ে পরবর্তী আরএস রেকর্ডের ভুক্তিই সাধারণত আইনগতভাবে প্রাধান্য পায়।

২.৪ বাংলাদেশ সার্ভে (বিএস) / সিটি জরিপ / মহানগর জরিপ

  • সময়কাল: ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগ থেকে বর্তমান পর্যন্ত।
  • আইনি ভিত্তি: আধুনিক ল্যান্ড সার্ভে রুলসের সাথে পঠিত ১৯৫০ সালের এসএটি অ্যাক্টের ১৪৪ ধারা।
  • তাৎপর্য: এটি হলো বর্তমান ও আধুনিক ক্যাডাস্ট্রাল জরিপ ব্যবস্থা। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো প্রধান শহরাঞ্চলগুলোতে এটি সিটি জরিপ বা মহানগর জরিপ হিসেবে চূড়ান্ত রূপ লাভ করেছে। এটি বর্তমানে যাবতীয় প্রশাসনিক লেনদেনের জন্য কার্যকর হালনাগাদ স্বত্বলিপি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
  • অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা: চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত কোনো বিএস খতিয়ানে আপনার জমি যদি ভুলভাবে রেকর্ডভুক্ত হয়ে থাকে, তবে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড সাধারণ নামজারির মাধ্যমে তা সংশোধন করতে পারেন না। ভুলভাবে প্রকাশিত চূড়ান্ত বিএস খতিয়ানের ভুক্তি এসএটি অ্যাক্টের ১৪৫এ ধারার অধীনে গঠিত বিশেষায়িত ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে (এলএসটি) চ্যালেঞ্জ বা মোকদ্দমা দায়ের করে প্রতিকার পেতে হবে।

৩. ই-নামজারি আবেদন প্রক্রিয়ার বিস্তারিত ও পর্যায়ক্রমিক বিবরণ

ভূমি মন্ত্রণালয় ভূমি নামজারি নির্দেশিকা, ২০২১-এর মাধ্যমে ই-নামজারির জন্য একটি সমন্বিত স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) সংবিধিবদ্ধ করেছে। পুরো প্রক্রিয়াটি এখন অনলাইনে পরিচালিত হয়, যা মধ্যস্বত্বভোগীদের দ্বারা শোষণের সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করেছে।

ধাপ ১: ডিজিটাল নিবন্ধন এবং ই-ফাইলিং

  1. পোর্টালে প্রবেশ: ভূমি মন্ত্রণালয়ের অফিশিয়াল পোর্টালে যান: mutation.land.gov.bd।
  2. পরিচয় যাচাইকরণ (ই-কেওয়াইসি): আবেদনকারীকে অবশ্যই নির্বাচন কমিশনের পরিচয় গেটওয়ে ব্যবহার করে তাঁদের পরিচয় যাচাই করতে হবে। আপনাকে আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নম্বর, জন্মতারিখ এবং একটি সচল মোবাইল নম্বর প্রদান করতে হবে। সিস্টেমটি সরাসরি জাতীয় সার্ভার থেকে আপনার বায়োমেট্রিক তথ্য এবং আলোকচিত্র সংগ্রহ করবে।
  3. আবেদনের তথ্য অন্তর্ভুক্তি: আপনাকে সতর্কতার সাথে ভূমির তফসিলের বিবরণ এন্ট্রি করতে হবে:
    • প্রশাসনিক স্তরবিন্যাস: বিভাগ, জেলা, উপজেলা, মৌজা।
    • জুরিসডিকশন লিস্ট (জে.এল.) নম্বর।
    • উদ্দিষ্ট জরিপ খতিয়ান (সিএস, এসএ, আরএস বা বিএস) এবং নির্দিষ্ট দাগ নম্বর।
    • নামজারি হতে যাওয়া ভূমির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ (শতাংশ বা একরে পরিমাপকৃত)।
    • ভূমির শ্রেণি বা শ্রেণিবিভাগ (যেমন—কৃষির জন্য নাল, বসতবাড়ির জন্য ভিটি, কলকারখানার জন্য শিল্প)।
  4. নথিপত্র আপলোড: আপনার নিবন্ধিত দলিল, পূর্ববর্তী দলিলের ধারাবাহিকতা (বায়া দলিল), পূর্ববর্তী খতিয়ানসমূহ, হালনাগাদ ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা এবং একটি পাসপোর্ট সাইজের ছবির সুস্পষ্ট ও পাঠযোগ্য পিডিএফ কপি স্ক্যান করে আপলোড করুন।

ধাপ ২: প্রাথমিক সংবিধিবদ্ধ ফি পরিশোধ

কোর্ট ফিস আইন, ১৮৭০ এবং ২০২১ সালের নির্দেশিকা অনুসারে, প্রক্রিয়াটি শুরু করার জন্য আবেদনকারীকে অগ্রিম ফি প্রদান করতে হবে। * আবেদন কোর্ট ফি: ২০.০০ টাকা * নোটিশ জারি ফি (প্রসেস ফি): ৫০.০০ টাকা * সর্বমোট প্রাথমিক পরিশোধ: ৭০.০০ টাকা * পরিশোধের মাধ্যম: এই ফি কেবল পোর্টালে সমন্বিত বিকাশ, নগদ, রকেটের মতো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অথবা ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড গেটওয়ের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই নগদ অর্থ গ্রহণ করা হয় না।

ধাপ ৩: প্রশাসনিক যাচাই-বাছাই এবং ইউএলএও-এর মাঠপর্যায়ের তদন্ত

  1. স্বয়ংক্রিয় ডায়েরিকরণ: ফি সফলভাবে পরিশোধের পর সিস্টেম একটি স্বতন্ত্র ট্র্যাকিং কেস নম্বর প্রস্তুত করে (যেমন: IX-I/2024-2025/1234)।
  2. সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর প্রাথমিক পর্যালোচনা: জমিটি তাঁর আঞ্চলিক এখতিয়ারভুক্ত কি না এবং তা ৬০ বিঘার ঊর্ধ্বসীমা লঙ্ঘন করে কি না, তা নিশ্চিত করতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) একটি প্রাথমিক পর্যালোচনা পরিচালনা করেন। এরপর নথিটি ডিজিটালভাবে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (ইউএলএও), যিনি সাধারণভাবে তহশিলদার নামে পরিচিত, তাঁর কাছে পাঠানো হয়।
  3. তহশিলদারের সরেজমিন যাচাই: ইউএলএও-কে একটি বাস্তব ও দালিলিক যাচাই পরিচালনা করতে হয়। তিনি নিম্নোক্ত বিষয়সমূহ সম্পাদন করবেন:
    • সরেজমিনে প্রত্যক্ষ দখল যাচাইয়ের জন্য ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবেন।
    • হস্তান্তরকারীর নাম সঠিকভাবে নথিভুক্ত রয়েছে কি না এবং হস্তান্তর সম্পাদন করার মতো তাঁর পর্যাপ্ত ভূমির স্থিতি (জমা-খারিজ অবস্থা) রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে ২ নং রেজিস্টার (জমাবন্দি) পরীক্ষা করবেন।
    • জমিটি অর্পিত সম্পত্তি, পরিত্যক্ত সম্পত্তি, খাস জমি অথবা সরকারের চলমান অধিগ্রহণের অধীন কি না, তা যাচাই করবেন।
  4. প্রস্তাবনা দাখিল: ৭ থেকে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে ইউএলএও একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর প্রস্তাবনা প্রতিবেদন (প্রস্তাবনা), যাতে একটি ট্রেস-ম্যাপ বা নকশা (চৌহদ্দি) অন্তর্ভুক্ত থাকে, আপলোড করবেন এবং নামজারিটি মঞ্জুর করা উচিত কি না সে বিষয়ে সুপারিশ পেশ করবেন।

ধাপ ৪: কানুনগোর যাচাই-বাছাই এবং শুনানির নোটিশ

  1. কারিগরি নিরীক্ষা: উপজেলা রাজস্ব পরিদর্শক (কানুনগো) ইউএলএও-এর প্রতিবেদন মূল্যায়ন করেন। কানুনগোর মূল দায়িত্ব হলো কারিগরি স্বত্ব-শৃঙ্খল (টাইটেল চেইন) নিরীক্ষা করা—অর্থাৎ সিএস জরিপ থেকে বর্তমান আবেদনকারী পর্যন্ত বায়া দলিলের ধারাবাহিকতা ত্রুটিহীনভাবে সংযুক্ত রয়েছে কি না তা নিশ্চিত করা।
  2. সংবিধিবদ্ধ সমন জারি: নথিটি কারিগরি যাচাইয়ে উত্তীর্ণ হলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) একটি আধা-বিচারিক শুনানির দিন নির্ধারণ করেন। আবেদনকারী, হস্তান্তরকারী এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো সহ-শরিককে লিখিত আপত্তি দাখিল করতে বা সশরীরে উপস্থিত হওয়ার জন্য এসএমএসের মাধ্যমে একটি ডিজিটাল সমন জারি করা হয়।

ধাপ ৫: সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর সম্মুখে আধা-বিচারিক শুনানি

  1. উপস্থিতি: নির্ধারিত তারিখে আবেদনকারী অথবা তাঁর আইনসম্মত প্রতিনিধিকে (পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন, ২০১২-এর অধীন নিবন্ধিত আমমোক্তারনামা দ্বারা ক্ষমতাপ্রাপ্ত) উপজেলা ভূমি অফিসে উপস্থিত হতে হবে।
  2. দালিলিক নিরীক্ষা: সহকারী কমিশনার (ভূমি) মূল নথিপত্র প্রদর্শনের নির্দেশ দেবেন। আপনাকে মূল নিবন্ধিত দলিল, মূল ওয়ারিশান সনদ (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে), মূল ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা এবং মূল বায়া দলিলসমূহ উপস্থাপন করতে হবে।
  3. বিচারিক নিষ্পত্তি: সহকারী কমিশনার (ভূমি) একটি সংক্ষিপ্ত শুনানি পরিচালনা করেন। কোনো সহ-শরিক আপত্তি উত্থাপন করলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনবেন। তবে, হাইকোর্ট বিভাগের সুপ্রতিষ্ঠিত নজির অনুযায়ী, সহকারী কমিশনার (ভূমি) তাঁর এখতিয়ার কেবল দখল যাচাই, নিবন্ধিত দলিল এবং রেকর্ড রক্ষণাবেক্ষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখবেন। জাল দলিল বা স্বত্ব বাতিলের মতো জটিল দেওয়ানি বিরোধ তিনি নিষ্পত্তি করবেন না।

৪. চূড়ান্তকরণ: ডিসিআর পরিশোধ, ই-খতিয়ান ও করের ধারাবাহিকতা

সহকারী কমিশনার (ভূমি) দালিলিক প্রমাণাদি এবং ইউএলএও-এর প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট হলে, নামজারি মঞ্জুর করে চূড়ান্ত আদেশে ইলেকট্রনিক স্বাক্ষর প্রদান করবেন।

৪.১ ডিসিআর নিষ্পত্তি

আদেশ জারির পর আবেদনকারী সিস্টেম-জেনারেটেড একটি এসএমএস পাবেন, যাতে তাঁকে ৩০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত ছাড়পত্র ফি পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়। এটি ডিসিআর (ডুপ্লিকেট কার্বন রসিদ) ফি হিসেবে পরিচিত। * নামজারি ফি (রেকর্ড সংশোধন ফি): ১,০০০.০০ টাকা * খতিয়ান কপি/সরবরাহ ফি: ১০০.০০ টাকা * মোট ডিসিআর-এর পরিমাণ: ১,১০০.০০ টাকা

নোট: বাংলাদেশে একটি নামজারির জন্য মোট সংবিধিবদ্ধ ব্যয়ের পরিমাণ সুনির্দিষ্টভাবে ১,১৫০.০০ টাকা (প্রাথমিক ৭০ টাকা + ডিসিআর ১,১০০ টাকা)। ভূমি অফিসের কোনো কর্মচারীর অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং তা ভূমি মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রের (স্মারক নং ৩১.০০.০০০০.০৪২.৬৮.০১৭.২০.৭০) সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

৪.২ অ্যালগরিদমিক খতিয়ান প্রস্তুতকরণ

অনলাইন গেটওয়ের মাধ্যমে ১,১০০ টাকার ডিসিআর ফি রিয়েল-টাইমে পরিশোধের সাথে সাথে সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিম্নলিখিত কার্যক্রম সম্পাদন করে: ১. ই-খতিয়ান প্রদান: এটি ডাউনলোডযোগ্য, ডিজিটালভাবে স্বাক্ষরিত এবং কিউআর কোডযুক্ত একটি ই-নামজারি খতিয়ান এবং ই-ডিসিআর প্রস্তুত করে। সরকারি সার্ভার থেকে সরাসরি নথির সত্যতা যাচাই করার জন্য যে কেউ এই কিউআর কোডটি স্ক্যান করতে পারেন। ২. ২ নং রেজিস্টার হালনাগাদকরণ: কেন্দ্রীয় ল্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এলআরএমএস) স্বয়ংক্রিয়ভাবে ২ নং রেজিস্টার (জমাবন্দি রেজিস্টার) হালনাগাদ করে বিক্রেতার হিসাব থেকে জমি কর্তন করে এবং ক্রেতার নামে একটি নতুন হোল্ডিং সৃষ্টি করে। ৩. কর একীভূতকরণ: নবসৃষ্ট নামজারি খতিয়ানটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইলেকট্রনিক ভূমি উন্নয়ন কর প্ল্যাটফর্মে (ldtax.gov.bd) স্থানান্তরিত হয়, যার ফলে নতুন মালিক অবিলম্বে অনলাইনে তাঁর বার্ষিক ভূমি করের বিল প্রস্তুত করতে পারেন।


৫. সংবিধিবদ্ধ প্রতিকার: আপিল, রিভিশন এবং রিভিউ

সহকারী কমিশনার (ভূমি) আপনার নামজারি আবেদন নামঞ্জুর করলে আপনি প্রতিকারহীন নন। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ (SAT Act)-এ প্রশাসনিক প্রতিকারের একটি সুদৃঢ় ও বহুমাত্রিক স্তরবিন্যাস প্রদান করা হয়েছে।

৫.১ এসএটি আইনের ১৪৯ ধারার অধীন রিভিউ

  • ফোরাম: যে সহকারী কমিশনার (ভূমি) আদেশ প্রদান করেছেন, তিনি নিজেই।
  • ভিত্তি: রিভিউ কেবল করণিক বা গাণিতিক ভুল সংশোধন, নথিতে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান ভুলের প্রতিকার, অথবা যথাযথ সতর্কতা সত্ত্বেও মূল শুনানির সময় উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি এমন কোনো নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ দালিলিক প্রমাণাদি আবিষ্কারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
  • তামাদির মেয়াদ: মূল আদেশের তারিখ থেকে ৩০ দিন।

৫.২ এসএটি আইনের ১৪৭ ধারার অধীন আপিল

  • ফোরাম: অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) [এডিসি (রেভিনিউ)] অথবা সংশ্লিষ্ট জেলার কালেক্টর/জেলা প্রশাসক (ডিসি)।
  • এখতিয়ার: এটি ঘটনা ও আইন উভয় বিষয়ের পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা। এডিসি (রেভিনিউ) দলিলসমূহ পুনঃপরীক্ষা করতে পারেন, ইউএলএও-এর কাছ থেকে নতুন প্রতিবেদন তলব করতে পারেন এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর সিদ্ধান্ত বহাল রাখা, বাতিল করা, পরিবর্তন করা বা পুনর্বিবেচনার জন্য রিমান্ডে পাঠানোর এখতিয়ার রাখেন।
  • তামাদির মেয়াদ: সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর আদেশের তারিখ থেকে ৩০ দিন (প্রজাস্বত্ব বিধিমালা, ১৯৫৪-এর ২৮ বিধির সাথে পঠিতব্য)।

৫.৩ এসএটি আইনের ১৪৮ ধারার অধীন রিভিশন

  • ফোরাম: বিভাগীয় কমিশনার।
  • এখতিয়ার: এটি একটি তদারকি কর্তৃপক্ষ। বিভাগীয় কমিশনার সাধারণত প্রাথমিক ঘটনাগত বিষয়াবলি পুনর্মূল্যায়ন করেন না; বরং তিনি বিচার করেন যে এডিসি (রেভিনিউ) তাঁর এখতিয়ারের মধ্যে থেকে কাজ করেছেন কি না, এখতিয়ার লঙ্ঘন করেছেন কি না কিংবা পদ্ধতিগত বা বস্তুগত আইনের অপপ্রয়োগ করেছেন কি না।
  • তামাদির মেয়াদ: এডিসি (রেভিনিউ)-এর আপিল আদেশের তারিখ থেকে ৩০ দিন।

৫.৪ ভূমি আপিল বোর্ডে দ্বিতীয় রিভিশন

  • ফোরাম: ভূমি আপিল বোর্ড (সরকারের একজন সিনিয়র সচিবের সভাপতিত্বে পরিচালিত), ঢাকা।
  • এখতিয়ার: এসএটি আইনের ১৫০ ধারা এবং ভূমি আপিল বোর্ড আইন, ১৯৮৯-এর অধীন এটি নির্বাহী রাজস্ব কাঠামোর চূড়ান্ত প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ।
  • তামাদির মেয়াদ: বিভাগীয় কমিশনারের আদেশের তারিখ থেকে ৯০ দিন।

৫.৫ সাংবিধানিক রিট এখতিয়ার

রাজস্ব কর্তৃপক্ষ যদি সম্পূর্ণ এখতিয়ারবহির্ভূত (ultra vires) কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করে, প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতি লঙ্ঘন করে (যেমন—কারণ দর্শানোর নোটিশ বা শুনানির সুযোগ প্রদান না করে আপনার নামজারি বাতিল করা), অথবা আইনের গুরুতর কোনো ভুল করে, তবে সংক্ষুব্ধ পক্ষ অধস্তন আপিল ফোরামগুলো এড়িয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীন সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করতে পারেন।


৬. প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও যাচাইকরণ সংক্রান্ত চেকলিস্ট

সঠিক নথিপত্র দাখিলে ব্যর্থতাই নামজারি আবেদন নামঞ্জুর হওয়ার প্রধান কারণ। নিশ্চিত করুন যে আপলোডের জন্য নিম্নে উল্লিখিত নথিপত্রগুলোর স্ক্যান কপি আপনার নিকট প্রস্তুত রয়েছে এবং শুনানির সময় প্রদর্শনের জন্য সেগুলোর মূল কপি সংরক্ষিত আছে:

# দলিলের শ্রেণি/বিভাগ সুনির্দিষ্ট সংবিধিবদ্ধ / আইনগত প্রকৃতি নামজারি নথিতে লক্ষ্যণীয় উদ্দেশ্য
১ হস্তান্তর দলিল রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮-এর অধীন মূল রেজিস্ট্রিকৃত দলিল (বিক্রয়/কবলা, হেবা, এওয়াজ/বিনিময়, বণ্টননামা)। আইনানুগ মালিকানা হস্তান্তরের প্রাথমিক ও প্রধান প্রমাণক দলিল।
২ মালিকানা হস্তান্তরের ধারাবাহিক দলিল বা স্বত্বের শৃঙ্খল (বায়া দলিল) বর্তমান হস্তান্তরকারীকে মূল ভিত্তিস্বরূপ জরিপের সাথে সংযুক্তকারী পূর্ববর্তী ঐতিহাসিক দলিলসমূহের সহিমুহুরি (সার্টিফাইড) নকল। হস্তান্তরকারীর অর্জিত স্বত্ব-সক্ষমতা এবং নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ভেজাল মালিকানার ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে।
৩ মূল জরিপ খতিয়ানসমূহ সিএস, এসএ, আরএস এবং বিএস / সিটি জরিপ খতিয়ানের সহিমুহুরি নকল (eporcha.gov.bd-এর মাধ্যমে প্রাপ্তব্য)। মালিকানার ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা প্রতিষ্ঠা করে এবং উদ্দিষ্ট প্লট/দাগ নম্বর যাচাই করে।
৪ সরাসরি পূর্ববর্তী নামজারি খতিয়ান সরাসরি হস্তান্তরকারীর নামে ডিজিটালভাবে সত্যায়িত নামজারি খতিয়ান এবং ডিসিআর (DCR)। সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ৫৩সি ধারার পূর্বশর্ত—পূর্ববর্তী নামজারি ব্যতীত হস্তান্তর সংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা বা শর্ত পূরণ করে।
৫ ভূমি উন্নয়ন কর (এলডিটি) দাখিলা/রসিদ ldtax.gov.bd হতে সংগৃহীত চলতি অর্থবছরের খাজনা দাখিলা। সম্পত্তিটি সরকারের বকেয়া ভূমি রাজস্ব/খাজনা হতে সম্পূর্ণ মুক্ত মর্মে যাচাই করে।
৬ ওয়ারিশান সনদ (ওয়ারিশ সনদ) সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর বা ইউপি চেয়ারম্যান কর্তৃক ইস্যুকৃত সংবিধিবদ্ধ সনদ, যাতে বৈধ ওয়ারিশগণের বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ থাকে। ব্যক্তিগত আইনের অধীনে সংখ্যানুপাতিক হারে নামজারি অনুমোদনের জন্য উত্তরাধিকার সংক্রান্ত মামলায় বাধ্যতামূলক।
৭ ট্রেস ম্যাপ ও স্কেচ প্ল্যান (নকশা) সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত বা সীমায়িত দখল (চৌহদ্দি) প্রদর্শনকারী স্কেলভিত্তিক বা পরিমাপযুক্ত নকশা। ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (ULAO) কর্তৃক যাচাইকালে সহ-শরিকদের মধ্যে জমির সীমানা নির্ধারণ সংক্রান্ত বিরোধ দূর করে।
৮ রেজিস্ট্রিকৃত পাওয়ার অব অ্যাটর্নি (আমমোক্তারনামা) পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন, ২০১২ অনুসারে প্রস্তুতকৃত অপ্রত্যাহারযোগ্য/সাধারণ আমমোক্তারনামা। সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর নিকট কোনো তৃতীয় পক্ষ বা আইনি কৌঁসুলির প্রতিনিধিত্ব করার আইনগত কর্তৃত্ব প্রদান করে।

৭. সরকারি ফি, নিষ্পত্তির সময়সীমা ও দণ্ডবিধি সংক্রান্ত মেট্রিক্স

৭.১ সুনির্দিষ্ট ফি কাঠামো

এই নির্দেশিকার সর্বত্র যেমনটি পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে, ভূমি মন্ত্রণালয় সকল প্রকার অননুমোদিত প্রশাসনিক খরচ বাতিল করেছে। এই ফি কাঠামো বাংলাদেশের সকল আঞ্চলিক উপজেলা এবং সার্কেলের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য: * প্রাথমিক আবেদন ও নোটিশ জারি ফি: ৭০ টাকা * চূড়ান্ত ডিসিআর ও খতিয়ান প্রদান ফি: ১,১০০ টাকা * সর্বমোট পুঞ্জীভূত ফি: ১,১৫০ টাকা

৭.২ সংবিধিবদ্ধ নিষ্পত্তির সময়সীমা

সিটিজেন চার্টার এবং ২০২১ সালের নির্দেশিকা অনুসারে ই-নামজারি আবেদন নিষ্পত্তির জন্য কঠোর সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে: * সাধারণ ক্ষেত্রসমূহে: ডিজিটাল আবেদন দাখিল থেকে শুরু করে খতিয়ান প্রস্তুত পর্যন্ত ২৮ কার্যদিবস। * মহানগর / বাণিজ্যিক পর্যায়: ৭ থেকে ১৫ কার্যদিবস। * প্রবাসী / রেমিট্যান্স অগ্রাধিকার পর্যায়: ৯ কার্যদিবস (মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার সাপেক্ষে, যেখানে বৈধ ভিসা ও রেমিট্যান্সের প্রমাণের মতো যাচাইকৃত প্রবাসী নথিপত্রসহ অগ্রাধিকার চাওয়া হয়)। * বিরোধহীন উত্তরাধিকার পর্যায়: ১৫ থেকে ২১ কার্যদিবস।

৭.৩ প্রতারণামূলক নামজারির ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক পরিণতি

নামজারি প্রক্রিয়াকে অসদুপায়ে প্রভাবিত বা কারচুপি করার প্রচেষ্টার ফলে কঠোর ফৌজদারি দায় উদ্ভূত হয়। * দণ্ডবিধি, ১৮৬০: জাল বায়া দলিল প্রস্তুত করা, ভুয়া ওয়ারিশান সনদ দাখিল করা কিংবা ই-নামজারি শুনানির সময় কোনো ব্যক্তির ছদ্মবেশ ধারণ বা ভুয়া পরিচয়ে উপস্থিত হওয়ার ঘটনা ঘটলে দণ্ডবিধির ধারা ৪১৯ (ব্যক্তি-ছদ্মবেশ ধারণের মাধ্যমে প্রতারণা), ধারা ৪২০ (প্রতারণা), ধারা ৪৬৫ (জালিয়াতি), ধারা ৪৬৮ (প্রতারণার উদ্দেশ্যে জালিয়াতি) এবং ধারা ৪৭১ (জাল দলিল খাঁটি হিসেবে ব্যবহার)-এর অধীন ফৌজদারি বিচারিক কার্যক্রম শুরু হবে। * শাস্তির মধ্যে ৩ থেকে ৭ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তদুপরি, এই ধরনের জালিয়াতিতে রাজস্ব বিভাগের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী যোগসাজশ করলে তিনি তাৎক্ষণিক বরখাস্ত এবং ফৌজদারি সহ-দায়ের মুখোমুখি হবেন।


৮. সচরাচর আইনি ফাঁদ ও বাস্তবভিত্তিক পরামর্শ

ডিজিটালাইজড ব্যবস্থা সত্ত্বেও, বাংলাদেশের সম্পত্তি আইনে এমন কিছু গোপন ফাঁদ রয়েছে যা নামজারি আবেদনকে লাইনচ্যুত বা বাতিল করে দিতে পারে। আইনজ্ঞ ও আবেদনকারীদের নিম্নলিখিত ক্ষেত্রসমূহের বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে।

৮.১ অর্পিত সম্পত্তি (অর্পিত সম্পত্তি) সংক্রান্ত ফাঁদ

  • সমস্যা: ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের পর ভারতে অভিবাসিত ব্যক্তিদের সম্পত্তি শত্রু সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়, যা পরবর্তীকালে অর্পিত সম্পত্তি নামে অভিহিত হয়। অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ তালিকার "ক" বা "খ" তফসিলভুক্ত জমির নামজারি সহকারী কমিশনার (ভূমি) কর্তৃক করা আইনত সম্ভব নয়।
  • সতর্কতা: যেকোনো জমি ক্রয়ের পূর্বে, বিশেষ করে ঐতিহাসিকভাবে হিন্দু মালিকানার শৃঙ্খল থাকা জমি ক্রয়ের ক্ষেত্রে, আপনাকে অবশ্যই অর্পিত সম্পত্তির গেজেট মিলিয়ে যাচাই করতে হবে। জমিটি যদি গেজেটভুক্ত হয়, তবে সহকারী কমিশনার (ভূমি) নামজারি সরাসরি খারিজ করে দেবেন। এর একমাত্র প্রতিকার হলো অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন, ২০০১ (২০১৩ সালে সংশোধিত)-এর অধীন অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ ট্রাইব্যুনাল থেকে জমি অবমুক্তির চূড়ান্ত ডিক্রি লাভ করা।

৮.২ অবিভক্ত যৌথ জোত (এজমালি জমি)

  • সমস্যা: বাংলাদেশে একাধিক ওয়ারিশ কর্তৃক একটি বড় খণ্ডের জমি উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করে কোনো আনুষ্ঠানিক বণ্টন না করেই জমির সুনির্দিষ্ট কোনো কোণ বা অংশ বিক্রয় করে ফেলা অত্যন্ত সাধারণ একটি বিষয়। সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ৫৩ডি ধারার অধীন অবিভক্ত যৌথ সম্পত্তির কোনো সুনির্দিষ্ট সীমায়িত অংশ হস্তান্তর করা অত্যন্ত জটিল ও সংকটপূর্ণ।
  • ঝুঁকি: আপনি যদি ৫০ শতাংশের একটি যৌথ প্লটের সুনির্দিষ্ট ৫ শতাংশ কোনো প্রান্ত বা কোণ ক্রয় করেন এবং মূল সহ-শরিকদের মধ্যে কোনো রেজিস্ট্রিকৃত বণ্টননামা দলিল না থাকে, তবে সহকারী কমিশনার (ভূমি) আপনার নামে সেই নির্দিষ্ট সীমায়িত বাস্তব প্লটটির নামজারি করতে অস্বীকৃতি জানাবেন। পরিবর্তে, তিনি কেবল একটি সহমিল (যৌথ) খতিয়ান ইস্যু করবেন, যা আপনাকে সমগ্র ৫০ শতাংশের একটি ভগ্নাংশের মালিক করে তুলবে। এর ফলে অন্যান্য সহ-শরিকদের দ্বারা উচ্ছেদের মুখে আপনার বাস্তব দখল আইনত চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। যৌথ প্লটের কোনো অংশ ক্রয়ের পূর্বে সর্বদা একটি রেজিস্ট্রিকৃত বণ্টননামা দাবি করুন।

৮.৩ ভূমি অধিগ্রহণের ছায়া

  • সমস্যা: সরকার প্রায়শই অবকাঠামোগত প্রকল্পের (রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎ কেন্দ্র) জন্য ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি অধিগ্রহণ করে থাকে। স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইন, ২০১৭ (২০১৭ সনের ৯ নং আইন)-এর ধারা ৪-এর অধীনে অধিগ্রহণের আনুষ্ঠানিক নোটিশ গেজেটভুক্ত হওয়ার সাথে সাথেই উক্ত সম্পত্তির উপর তাৎক্ষণিক আইনগত স্থগিতাদেশ বা নিষেধাজ্ঞা বলবৎ হয়।
  • ঝুঁকি: অধিগ্রহণের প্রক্রিয়াধীন থাকা কোনো জমির প্রশাসনিক নামজারি নিষ্পত্তিতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) সংবিধিবদ্ধভাবে বারিত থাকেন। আপনার উদ্দিষ্ট প্লটটি সরকার কর্তৃক অধিগ্রহণের তালিকাভুক্ত নয় তা নিশ্চিত হতে সর্বদা জেলা প্রশাসকের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখা থেকে যাচাই করে নিন।

৮.৪ তামাদি আইনের প্রয়োগে বিলম্বিত আপিল দায়ের

  • সমস্যা: আপনি যদি জানতে পারেন যে ৬ মাস পূর্বে কেউ প্রতারণামূলকভাবে আপনার জমির নামজারি করিয়ে নিয়েছে, কিন্তু ১৪৭ ধারার অধীনে আপিল দায়েরের আইনগত সময়সীমা মাত্র ৩০ দিন—তাহলে করণীয় কী?
  • আইনগত প্রতিকার: স্টেট একুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি (SAT) অ্যাক্ট-এর ১৫১ ধারার অধীন রাজস্ব আপিলের ক্ষেত্রে তামাদি আইন, ১৯০৮ (Limitation Act, 1908)-এর বিধানাবলী প্রযোজ্য হয়। আপনি তামাদি আইনের ধারা ৫ (সময়সীমা বৃদ্ধি)-এর অধীনে "বিলম্ব মার্জনা" (condonation of delay) প্রার্থনা করে একটি দরখাস্ত দাখিলের মাধ্যমে বিলম্বিত আপিল দায়ের করতে পারেন। আপনাকে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) বা এডিসি (রেভ)-এর নিকট "যথেষ্ট কারণ" (sufficient cause) প্রমাণ করতে হবে—যেমন আপনার নিকট থেকে প্রতারণার বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছিল, সমন জারি ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল, অথবা আপনি গুরুতর চিকিৎসাজনিত কারণে অপারগ ছিলেন। অধিকন্তু, তামাদি আইনের ১২ ধারা অনুসারে, ভূমি অফিস কর্তৃক উক্ত প্রতারণামূলক আদেশের সহিমুহুরি নকল সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় সময় উক্ত ৩০ দিনের হিসাব থেকে বাদ যাবে।

সচরাচর জিজ্ঞাস্য (FAQ)

◆ সম্পর্কিত প্র্যাকটিস গাইড ও বিশ্লেষণ

    <li style="margin-bottom:12px; line-height:1.5;">
      <a href="/bn/buying-land-in-bangladesh-title-search-due-diligence-bn/" style="color:#C5A059; font-weight:600; text-decoration:none; font-size:14px; display:inline-block; transition:color 0.2s;">&bull; বাংলাদেশে জমি ক্রয়ের আইনি সতর্কতা: সাব-রেজিস্ট্রি দলিল তল্লাশি, খতিয়ান যাচাই ও ডিউ ডিলিজেন্স চেকলিস্ট</a>
    </li>
    
    <li style="margin-bottom:12px; line-height:1.5;">
      <a href="/bn/property-partition-batowara-suit-bangladesh-bn/" style="color:#C5A059; font-weight:600; text-decoration:none; font-size:14px; display:inline-block; transition:color 0.2s;">&bull; পারিবারিক সম্পত্তি বাটোয়ারা মামলা: ভাইবোনদের মধ্যে জমি বন্টন ও দেওয়ানি আদালতের প্রতিকার</a>
    </li>
    
    <li style="margin-bottom:12px; line-height:1.5;">
      <a href="/bn/khas-land-lease-allocation-eviction-bangladesh-bn/" style="color:#C5A059; font-weight:600; text-decoration:none; font-size:14px; display:inline-block; transition:color 0.2s;">&bull; খাস জমি বন্দোবস্ত, ৯৯ বছরের লিজ ও অবৈধ উচ্ছেদ প্রতিরোধ: বাংলাদেশে ভূমিহীন ও শিল্পের আইনি অধিকার</a>
    </li>
    
    <li style="margin-bottom:12px; line-height:1.5;">
      <a href="/bn/section-144-crpc-land-injunction-executive-magistrate-bangladesh-bn/" style="color:#C5A059; font-weight:600; text-decoration:none; font-size:14px; display:inline-block; transition:color 0.2s;">&bull; জমির বিরোধে ১৪৪ ধারা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নিষেধাজ্ঞা: জরুরি শান্তি রক্ষা ও দখল সুরক্ষা গাইড</a>
    </li>

সরকারি কর্তৃপক্ষ, গেজেট ও নিয়ন্ত্রক পোর্টাল

নিয়ন্ত্রক মূল আইনসমূহ: সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ১৮৮২, রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮, রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০, বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯১

<div style="margin-bottom:12px; padding-bottom:12px; border-bottom:1px solid #1E293B;">
  <a href="https://land.gov.bd/" target="_blank" rel="noopener noreferrer" style="color:#C5A059; font-weight:600; font-size:14px; text-decoration:underline;">Ministry of Land Citizen Services Portal &nearr;</a>
  <p style="color:#94A3B8; font-size:12px; margin:4px 0 0 0; line-height:1.4;">Online Khatian (e-Porcha), Mutation (e-Namjari) & Land Development Tax (LD Tax)</p>
</div>

<div style="margin-bottom:12px; padding-bottom:12px; border-bottom:1px solid #1E293B;">
  <a href="https://registration.gov.bd/" target="_blank" rel="noopener noreferrer" style="color:#C5A059; font-weight:600; font-size:14px; text-decoration:underline;">Directorate of Registration, Bangladesh &nearr;</a>
  <p style="color:#94A3B8; font-size:12px; margin:4px 0 0 0; line-height:1.4;">Sub-Registry Stamp Duty Schedules, Deed Registration & Search Protocols</p>
</div>

<div style="margin-bottom:12px; padding-bottom:12px; border-bottom:1px solid #1E293B;">
  <a href="https://rajuk.gov.bd/" target="_blank" rel="noopener noreferrer" style="color:#C5A059; font-weight:600; font-size:14px; text-decoration:underline;">RAJUK (Capital Development Authority) &nearr;</a>
  <p style="color:#94A3B8; font-size:12px; margin:4px 0 0 0; line-height:1.4;">Dhaka Building Approval Rules, Layout Clearances & Real Estate Regulations</p>
</div>

অনলাইনে ই-নামজারি করতে মোট কত টাকা সরকারি ফি প্রদান করতে হয়?

ভূমি মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুযায়ী ই-নামজারির নির্ধারিত সর্বমোট সরকারি ফি ১,১৭০/- (এক হাজার একশত সত্তর) টাকা। আবেদন দাখিলের সময় কোর্ট ফি ২০ টাকা ও নোটিশ জারি ফি ৫০ টাকা—মোট ৭০ টাকা পরিশোধ করতে হয়। আবেদন মঞ্জুর হওয়ার পর রেকর্ড সংশোধন ফি ১,০০০ টাকা এবং খতিয়ান ফি ১০০ টাকা—মোট ১,১০০ টাকা পরিশোধ করে ডিসিআর ও খতিয়ান ডাউনলোড করতে হয়। এর বাইরে অতিরিক্ত কোনো ফি প্রদান আইনত দণ্ডনীয়।

ই-নামজারি আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে আইনত কত দিন সময় লাগে?

ভূমি নামজারি নির্দেশিকা ২০২১ অনুযায়ী, সাধারণ আবেদনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২৮ কার্যদিবসের মধ্যে নামজারি প্রক্রিয়া নিষ্পত্তির বাধ্যবাধকতা রয়েছে। মহানগর এলাকার ক্ষেত্রে তা অনেক সময় আরও দ্রুত সম্পন্ন হয়। অন্যদিকে প্রবাসী আবেদনকারীদের জন্য এবং বিশেষ শিল্প প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে তা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নির্ধারিত দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে।

ই-নামজারি আবেদন দাখিলের জন্য কী কী কাগজপত্র স্ক্যান করে আপলোড করতে হয়?

আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র (NID), পাসপোর্ট সাইজের ছবি, সর্বশেষ নামজারি ও জমাভাগ খতিয়ান (পিঠ খতিয়ান), মূল ক্রয়কৃত সাব-কবলা দলিল বা হেবা দলিল বা অন্য কোনো হস্তান্তর দলিল, হালনাগাদ ভূমি উন্নয়ন কর (দাখিলা) পরিশোধের রশিদ এবং উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্য হলে স্থানীয় সরকারের ওয়ারিশান সনদ আপলোড করতে হয়।

অনলাইন থেকে ডাউনলোডকৃত কিউআর কোডযুক্ত ই-পর্চা ও ডিসিআর কি আদালতে গ্রহণযোগ্য?

হ্যাঁ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬ এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র মোতাবেক কিউআর (QR) কোড সংবলিত ই-পর্চা ও ই-ডিসিআর সম্পূর্ণ আইনত বৈধ ও সরকারিভাবে প্রত্যয়িত। কিউআর কোড স্ক্যান করে অনলাইন ডাটাবেজের সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা যায় বিধায় ব্যাংক ঋণ গ্রহণ, জমি বিক্রয় বা দেওয়ানি আদালতে প্রমাণের জন্য এর পৃথক সিল-স্বাক্ষরের প্রয়োজন হয় না।

সহকারী কমিশনার (ভূমি) নামজারি আবেদন নামঞ্জুর করলে প্রতিকার কী?

ই-নামজারি আবেদন নামঞ্জুর হলে আদেশের সার্টিফাইড কপি বা অনলাইন কপি গ্রহণ করে স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি অ্যাক্ট ১৯৫০-এর ১৪৭ ধারা মোতাবেক আদেশ প্রদানের ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)-এর কার্যালয়ে 'নামজারি মিস আপিল' দায়ের করতে হবে। আপিলেও প্রতিকার না পেলে ভূমি আপিল বোর্ডে আপিল করার সুযোগ রয়েছে।

ওয়ারিশান সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির ক্ষেত্রে নামজারি করার বিশেষ নিয়ম কী?

ওয়ারিশান সম্পত্তির ক্ষেত্রে নামজারি আবেদনের পূর্বে সকল বৈধ ওয়ারিশগণের তালিকা সম্বলিত স্থানীয় পৌরসভা/ইউনিয়ন পরিষদ প্রদত্ত ওয়ারিশান সনদ দাখিল করতে হয়। যদি ওয়ারিশদের মধ্যে রেজিস্ট্রিকৃত বা পারিবারিক বণ্টননামা দলিল থাকে, তবে সেই বণ্টন দলিল অনুসারে যার যার অংশে পৃথক খতিয়ান বা যৌথ খতিয়ানের আবেদন করা যায়।

ব্যক্তিগত আইনি সহায়তা

আপনার পরিস্থিতি অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট আইনি সহায়তা প্রয়োজন?

আমাদের সিনিয়র আইনজীবী ও রেগুলেটরি বিশেষজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করে আপনার ঝুঁকি নিরূপণ ও সমাধান নিশ্চিত করুন।

রক্ষণাবেক্ষণ লুপ

এই গাইডে সমস্যা দেখেছেন?

ভুল উদ্ধৃতি, ভাঙা লিংক, অনুবাদ বা বর্তমানতার সমস্যা জানাতে রেকর্ড আইডিসহ সম্পাদকীয় টিমকে জানান। এটি স্বয়ংক্রিয় আইনি আপডেটের নিশ্চয়তা নয়।